জীবনের কিছু মুহূর্ত থাকে, যা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে স্মৃতির পাতায় স্থায়ী রূপ নেয়। এই গল্প সেই সব দিনের। কোনো কোনো দিন এমনভাবে যেন স্বপ্নের মতো সুন্দর হয়ে যায়। গতানুগতিক রোজকার জীবনের বাইরে গিয়ে সেই দিনগুলোতে আমরা হুটহাট অন্য রকম কিছু করে বসি। ধরুন, হঠাৎ একদিন আপনার ঘুম ভাঙল হিমালয়ঘেরা শান্ত এক উপত্যকায়। আপনার প্রথম অনুভূতি কী হবে? ঠিক তেমন কিছুই আমাদের হয়েছিল। বলছিলাম আমাদের নেপাল ভ্রমণের কথা, যেখানে পথ হারানো মানেই নতুন কিছু খুঁজে পাওয়া। দাঁড়ান, শুরু থেকে গল্প বলি।
ডিসেম্বরের এক দুপুরে ক্লাসরুমের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছি। তখন ঘড়িতে ঠিক ১২টা বেজে ৯ মিনিট ৮ সেকেন্ড। ঠিক সেই মুহূর্তেই একটা আশ্চর্যজনক সংকল্প গড়ে উঠল আমাদের মনে—কখন ১২টা বেজে ১২ মিনিট ১২ সেকেন্ড বাজবে! শুধুমাত্র একটা সেকেন্ডের জন্য যখন সে সময়টা ধরা দিল, যেন আরেকটা জন্ম হলো আমাদের। ঠিক সেই মুহূর্তেই চৈতন্য ঘটল—জীবনটা তো মুহূর্তের সমষ্টি বৈ কিছু নয়। কোনোভাবেই সেটা ঘরের এক কোণে থেকে কাটিয়ে দেওয়া যাবে না।
যেই ভাবা, সেই কাজ। তাৎক্ষণিকভাবে আমরা দুই বান্ধবী মিলে ঠিক করে ফেললাম যে, নেপাল যাব। এক মাসেরও কম সময় হাতে নিয়ে, "উঠল বাই তো কটক যাই!"—এমন একটা অবস্থা দাঁড়াল আমাদের। টিকিট আর হোস্টেলের বুকিং করে নিজেদের তিন বছরের সঞ্চয় ভেঙে, কোনো পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই বেরিয়ে পড়লাম হিমালয়কন্যা দর্শনের উদ্দেশ্যে।
৭ জানুয়ারি ২০২৫, উঠে পড়লাম কাঠমান্ডুর এক ফ্লাইটে। প্রথম আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, আমাদের প্রথমবার বিদেশযাত্রা। প্রথম বিমানযাত্রার অনুভূতি ঠিক কতটা সুন্দর হয়, তা এই দিনটি না এলে কখনো জানতে পারতাম না। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামতেই দেখলাম ভিন্ন দেশ, ভিন্ন মানুষ। দুপুর একটা নাগাদ বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে প্রথমে ডলার ভাঙিয়ে সিম কার্ড কিনি। সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের গন্তব্য থামেলের দিকে। ট্যাক্সিতে চেপে পৌঁছাই থামেলের কালধারার এক শান্ত হোস্টেলে। হোস্টেলের নাম ওয়ান্ডার থার্স্ট হোস্টেল। নামের মতোই সেখানে থাকতে আসা মানুষগুলোও। সবার একটাই উদ্দেশ্য—ঘুরে বেড়ানো। নতুন নতুন সৌন্দর্য দেখা, নতুন মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া, নতুন অভিজ্ঞতার স্বাদ নেওয়া। এক কথায়, জীবনকে উপভোগ করা।
থামেলের প্রথম সন্ধ্যায় আমরা বেরিয়ে পড়ি চারদিকটা ঘুরে দেখতে। নতুন শহরে, নতুন মানুষদের মাঝে গুগল ম্যাপ ভরসা হলেও বারবার পথ হারাই। প্রতিবারই স্থানীয়রা হাসিমুখে সাহায্য করেন। প্রথম দিনেই খাই নেপালের বিখ্যাত মোমো, থেনথুক, ডালভাত আর চা। স্থানীয়দের আন্তরিক আতিথেয়তায় মন ভরে যায়।
পরের দিন আমাদের অনেক কাজ। পোখরা যাওয়ার বাসের টিকিট বুক করতে হবে, আরও ডলার ভাঙাতে হবে। গুগল ম্যাপের ভরসায় সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ি আরও একবার। গার্ডেন অব ড্রিমসে যাব বলে বের হলেও পৌঁছে যাই ত্রিদেবী মন্দিরে। ফেরার পথে পাই একটি তিব্বতি বুকশপ। শেষমেশ খুঁজে পেলাম গার্ডেন অব ড্রিমস বা বিখ্যাত ছয় ঋতুর উদ্যান। বহুকাল পরেও এই জায়গাটির সৌন্দর্য আজও একই রকম। সব বয়সী মানুষের মিলনমেলা বসেছে সেখানে। কেউ টিকটক ভিডিও বানাচ্ছে, কেউবা সারাদিনের ক্লান্তি শেষে এখানে এসে অবসর সময় কাটাচ্ছে।
কাঠমান্ডু থেকে পোখরা যাওয়ার জন্য খুঁজে খুঁজে একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে গেলাম বাসের টিকিট বুক করতে। এজেন্সির নাম হিমালয়ান ট্রাভেল এজেন্সি। পরদিন ভোর সাড়ে সাতটার সময় বেরিয়ে পড়ি পোখরার উদ্দেশ্যে। বাসের জানালা দিয়ে নাম না-জানা পাহাড়, নদী, দুর্গম রাস্তা পেরিয়ে বিকেল পাঁচটা নাগাদ পৌঁছে যাই হোস্টেল ফরেস্ট লেকে। একদম ফেওয়া লেকের গা ঘেঁষে, চমৎকার এক জায়গা! ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছাদে বসে লেকের স্বচ্ছ জল দেখা যায়। দূরে শান্তি স্তূপ আর শিবের স্তূপ দেখা যায়। আর যেদিকে তাকাই না কেন, বরফঢাকা অন্নপূর্ণার চূড়া যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে।
কয়েক দিনের জন্য পোখরায় থাকা সময়ের মধ্যে যত দর্শনীয় জায়গায় গিয়েছি, হোক সে পাহাড়চূড়া কিংবা গুপ্তেশ্বর মহাদেবের মতো অতল গুহা; কিন্তু ফেওয়া লেকের পাশে নিঃশব্দে বসে থাকাই ছিল স্বপ্নের মতো সুন্দর। আরও বেশি ভালো লাগে ভিনদেশি মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে। এলিজা, রেবেকা, অজিত, আসমান—এরা সবাই ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে এসেছে। কিন্তু তাদের ধ্যানধারণা, জীবনচিন্তা কীভাবে যেন আমাদের সঙ্গে মিলে গেল। ভিনদেশে এসেও ওদের মধ্যে বন্ধু খুঁজে পাই।
এরপর ফেওয়া লেকের মায়া কাটিয়ে ফিরে আসতে হয় কাঠমান্ডুতে। তত দিনে এক সপ্তাহ কেটে গেছে। রইল বাকি আর এক সপ্তাহ। তাই ফিরে যাওয়ার ভাবনা পাশে সরিয়ে রেখে, বাকি দিনগুলো উপভোগ করায় মন দিই।
এবার ফিরে এসে উঠি বার্ডস নেস্ট হোস্টেল। এখানে এসে দেখা হয় কোকো আর চুচুর সঙ্গে। নাহ, এরা মানুষ নয়, বরং আরও ভালো কেউ। এরা হলো এই হোস্টেলের পোষা কুকুর। একজন যেমন শান্ত, আরেকজন ঠিক তেমনই দুরন্ত। আর কী চাই! ওদের সঙ্গে প্রত্যেকটা দিনই ভরপুর আনন্দে কেটে গেল।
বৌদ্ধনাথ স্তূপ, পশুপতিনাথ মন্দির, দরবার স্কয়ার, স্বয়ম্ভুনাথ মন্দিরের মতো ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে গিয়ে মনে হলো, একটা দেশ এত সুন্দর হয়! দরবার স্কয়ার থেকে ফেরার পথে বারবার পথ হারাই। ষাটের দশকের ‘হিপ্পি ট্রেইল’ থেকে অনুপ্রাণিত ফ্রিক স্ট্রিটের কফি কালচার—অনেকের কাছে হয়তো নিতান্তই সাধারণ ব্যাপার কিংবা খানিকটা ছেলেমানুষি হলেও আমাদের কাছে এটা ছিল একটা মাইলফলক। যা আমাদের দুনিয়া চিনতে শিখিয়েছে, নিজের ওপর ভরসা করতে শিখিয়েছে।
ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর দিক কী জানেন? আমাদের মতে তা হলো, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারা। তাদের ভাষা, খাবার, জীবনযাপন, ধর্মীয় আচার-আচরণ সম্পর্কে জানা। এ ব্যাপারটাই নেপাল গিয়ে সত্যিকার অর্থে বুঝেছি।
কাঠমান্ডু এবং পোখরা মিলিয়ে আমরা ১৫ দিন থেকেছি। বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে যা ভয়ভীতি ছিল, তা মোটামুটি প্রথম দিনেই কেটে গিয়েছিল। বিমানবন্দরের সিম এক্সচেঞ্জের দোকানের দিদি থেকে শুরু করে সেখানকার ট্যাক্সিচালক, হোস্টেলের রিসেপশন, রেস্তোরাঁ থেকে মুদি দোকানদার, রাস্তায় হেঁটে চলা একজন পথচারী পর্যন্ত সবাই ভীষণ মিশুক আর সহায়ক।
তবে যাদের প্রশংসা না করলেই নয়, তারা হলো নেপালের রাস্তায়-রাস্তায় বেড়ে ওঠা সারমেয়র দল। এতটা বন্ধুসুলভ কুকুর! একটা-দুটো জায়গায় নয়; সব জায়গায়। আরেকটা মজার ব্যাপার হলো, নেপালে কোথাও বাসাবাড়িতে গ্রিল নেই। কখনো কোনো রুমে কেউ তালা দেয় না! মাঝে মাঝে আমরা তাই অবাক হয়ে ভাবছিলাম, এতটা নিরাপদ হতে পারে কোনো দেশ!
রাত দশটার পর পোখরায় লেকের পাশ ঘেঁষে হাঁটা, থামেল স্ট্রিটের অজস্র আলোর রোশনাই আর পাহাড়ি অলিগলিতে অসংখ্যবার হারিয়ে গিয়ে আমাদের হো হো হাসিতে ফেটে পড়া, ‘ব্যাপার না! পৃথিবী তো গোল, ঠিক খুঁজে নেব’—বলে গুগল ম্যাপ ধরে আবার এগিয়ে যাওয়া। পায়ে হাঁটা পথে হাজারো পাহাড়ি বাঁক, সিঁড়ির তো কোনো ইয়ত্তাই নেই! নাম না-জানা কত রঙবেরঙের পাহাড়ি ফুল, পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝরনা, পোখরা শহর ঘিরে থাকা অন্নপূর্ণা! কখনো তার চূড়ায় ঝিলমিল করে ওঠা সূর্যের আলো, আবার কখনো মেঘের চাদরে ঘিরে থাকা অদ্ভুত সুন্দর পর্বতমালা! আবার, শিবের স্তূপের ওপর থেকে যখন অন্নপূর্ণার চূড়ায় রোদের ঝিলিক দেখলাম, মনে হলো, পৃথিবী এত সুন্দর! এসবের জন্য হলেও তো শত বছর বেঁচে থাকা উচিত।
জীবনে যেকোনো কিছু করার জন্য মাটি কামড়ে পড়ে থাকার মতো তাগিদ দরকার। এই ভ্রমণ আমাদের সেই ব্যাপারটা আরও ভালো করে শিখিয়েছে। স্বয়ম্ভুনাথ মন্দির, বৌদ্ধ স্তূপ বা গুপ্তেশ্বর মহাদেবের গুহার শত শত সিঁড়ি বা পাহাড়ি বাঁক পাড় করে যখন একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, মনে হলো, সত্যিই ইচ্ছা থাকলেই সব হয়! জীবন তো এরকমই।
পাহাড় আমাদের শান্ত, স্নিগ্ধ জীবনের গল্প শোনায়। হিমালয়কন্যা নেপাল শোনায়, জীবন কোনো প্রতিযোগিতা নয়; বরং উপভোগ করার বিষয়। অনবরত ছুটে চলা জীবনে চলতে চলতে আমরা এই সহজ কথাটাই ভুলে যাই।
জীবনে অন্তত একবার ধীরগতিতে জীবন উপভোগ করাটা শিখে এলাম। কাঠমান্ডুতে সন্ধ্যার পর থেকে মাঝরাত অবধি বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় দল বেঁধে আড্ডা দেন মাঝবয়সি লোকজন। এ ছাড়া, নাচে-গানে জীবন কাটিয়ে দেন অনেকেই। তাঁদের দেখে মনে হলো—জীবনকে ভালোবাসতে হয়। আর দুঃখ? সে তো উড়িয়ে দেওয়ারই বিষয়।
এই ভ্রমণে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের কিছু চমৎকার মানুষের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে। ভারত, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, এমনকি দক্ষিণ আমেরিকার মানুষও ছিলেন। দু–চার দিনেই কেমন যেন আপন হয়ে গেল সবাই! কেউ বাচ্চাদের ইংরেজি শেখাচ্ছেন, কেউ পাহাড় চড়তে এসেছেন, কেউবা প্রকল্পের কাজে অথবা এমনি ঘুরতে এসেছেন। দেখলাম, কাজ ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য সবারই এক—নেপালকে চেনা।
এভাবেই দেখতে দেখতে শেষ সপ্তাহটা চলে গেল। এবার দেশে ফেরার পালা। এই ভ্রমণে পথ হারিয়ে অনেক নতুন জায়গার দেখা পেয়েছি। মানুষ কতটা আন্তরিক আর সহায়ক হতে পারে, তা জেনেছি। আবার আমরা যে আসলে একমাত্র ইচ্ছাশক্তি ছাড়া আর কারও ওপর নির্ভরশীল নই, সেটাও জানলাম জীবনে প্রথমবারের মতো হিমালয় দেখতে দেখতে। ছোটবেলায় পড়া গল্প-উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে এসে হিমালয়ের পাহাড়গুলোকে চোখের সামনে জীবন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে অঞ্জন দত্তের সেই গান—
"ছিল না বালাই সময়ের—
শুধু আকাশে একটা নেপালি গানের সুর।"